হারাধন কর্মকার, রাজস্থলী।
পাহাড় ঘেরা রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া বাজার। এই জনপদে কয়েক দশক ধরে শিক্ষা, ব্যবসা, সমাজসেবা, মানবিক কর্মকাণ্ড এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তিনি পাহাড়িকা লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী এস এম আলাউদ্দিন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিজেকে শুধু একজন ব্যবসায়ী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সম্প্রীতি, মানবাধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলা, সামাজিক সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং তরুণদের শিক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এস এম আলাউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের কারণে তিনি রাজস্থলীর পরিচিত একটি মুখে পরিণত হয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার চরশাহী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল এবং আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মানবিক বিভাগ থেকে সফলতার সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করার পর জীবিকার সন্ধানে তিনি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া এলাকায় চলে আসেন। অচেনা পরিবেশ, সীমিত সুযোগ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি পিছিয়ে যাননি। ধীরে ধীরে নিজের পরিশ্রম, সততা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হন।
পরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পাহাড়িকা লাইব্রেরি। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বহু শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় বই, শিক্ষা উপকরণ ও পরামর্শ পেয়ে উপকৃত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
ব্যক্তিজীবনে এস এম আলাউদ্দিন নূরন্নাহার বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে দুই যমজ ছেলে—এস এম রাকিবুজ্জামান ও এস এম সাকিবুল ইসলাম এবং একমাত্র কন্যা জান্নাতুল মাওয়া। সন্তানদের শিক্ষার প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে দুই ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত এবং অবসর সময়ে বাবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করেন। কন্যাও নিয়মিত লেখাপড়া করছে। পরিবার, সমাজ এবং কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে তিনি একটি আদর্শ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তুলেছেন।
ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবাকে তিনি জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে এশিয়া ছিন্নমূল মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশনের রাজস্থলী উপজেলা কমিটির সভাপতি হিসেবে মানবাধিকার রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের আজীবন সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, কমিউনিটি পুলিশিং, সচেতন নাগরিক সমাজ, বাঙ্গালহালিয়া বাজার পরিচালনা কমিটি, সিএনজি অ্যাসোসিয়েশন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, সামাজিক বিরোধ মীমাংসা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা তৈরিতে তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও তিনি কাজ করে আসছেন। পার্বত্য জেলা উন্নয়ন বোর্ড এবং এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে প্রথম শ্রেণির সরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাহাড়িকা এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয়দের অভিমত।
পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নেও তাঁর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কৃষি, বনজ ও ফলজ গাছের চারা রোপণ, বৃক্ষ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দপ্তর এবং সংগঠন থেকে তিনি সম্মাননা স্মারক, সনদপত্র ও পদক লাভ করেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী এস এম আলাউদ্দিন বর্তমানে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সদস্য এবং রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় উন্নয়ন, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে তাঁর সহকর্মীরা জানান।
বাঙ্গালহালিয়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা বলেন, মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো, অসহায়দের সহযোগিতা করা, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়া এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এস এম আলাউদ্দিনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের চেয়ে মানুষের কল্যাণকে তিনি অধিক গুরুত্ব দেন বলেই তাঁকে এলাকার মানুষ সম্মান করেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সমাজসেবা, শিক্ষা, মানবিক কর্মকাণ্ড, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদান যথাযথ মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাঁদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও তিনি একই নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে মানুষের পাশে থেকে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।
সংগ্রাম, সততা, পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এস এম আলাউদ্দিনের জীবনকাহিনী আজ অনেক তরুণের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। পাহাড়ি জনপদের একজন সাধারণ মানুষ থেকে সমাজের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে—অধ্যবসায়, সততা এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করতে পারে।