নিজস্ব প্রতিনিধি,ঈদগাঁও
নারীর নাম ছেননুয়াইং রাখাইন। কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর উত্তর রাখাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন তিনি। একবছর আগেও প্রতিদিন শ্রেণি কক্ষে শিশুদের পাঠদান করতেন। ব্ল্যাকবোর্ডে চকে লিখতেন অক্ষর,শেখাতেন ও স্বপ্ন দেখতে। সেই শ্রেণীকক্ষ এখন শুধুই স্মৃতি।
মামলার জটিলতা আর পারিবারিক ষড়যন্ত্র তার জীবনকে উল্টে দিয়েছে। হারিয়েছেন চাকরি ও বসতভিটা। এখন কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ভ্যানে করে খাবার বিক্রি করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই শিক্ষিকা।
জানা যায়,দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় ছিলো ছেননুয়াইং রাখাইন। শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন প্রিয় শিক্ষক। স্বামী মংছিথেইং ব্যবসা করতেন। দুজনের আয়েই চলছিল সংসার। সেই সংসারে অশান্তির সূচনা হলো পারিবারিক বিরোধে।
অভিযোগ উঠেছে যে,তারই ভগ্নিপতি মেথোইন রাখাইনের সঙ্গে বিরোধ থেকেই শুরু হয় সব বিপর্যয়।
শিক্ষিকার ভাষ্য, স্বামীর ব্যবসায় লোকসান হলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাধ্য হয়ে ভগ্নিপতির কাছে ১০ শতক বসতভিটা বন্ধক দিতে হয়। শর্ত ছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে না পারলে জমিটি বিক্রি করা যাবে। কিন্তু সেই সুযোগকে ব্যবহার করে ভগ্নিপতি তাকে বারবার অনৈতিক প্রস্তাব দিতে শুরু করেন বলে অভি যোগ করেন ছেননুয়াইং রাখাইন।
তার দাবি,ঐ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পাঁচ বছরের চুক্তি ভেঙে মাত্র নয় মাসের মাথায় তার বিরুদ্ধে চেক সংক্রান্ত মামলা করা হয়।
এই মামলার জেরে গত বছরের ২০ মার্চ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় তার একমাত্র নিশ্চিত আয়ের পথ। চাকরি হারিয়ে সংসারের চাকা থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখনই বাধ্য হয়ে জীবনযুদ্ধে নামেন তিনি।
সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে একটি ভ্রাম্যমাণ ভ্যান নিয়ে পর্যটকদের জন্য খাবার বিক্রি শুরু করেন। কখনো ভাজা নাস্তা বা হালকা খাবার। এভাবে দিন পার করছিলেন। তবে গত কিছুদিন ধরে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং রমজান শুরু হওয়ায় সেই ভ্যানের দোকানটিও বন্ধ রয়েছে।
ছেননুয়াইং রাখাইন জানান,শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে তিনিও ভগ্নিপতি মেথোইন রাখাইনে বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেন।
এদিকে শিক্ষিকার পরিবার দাবি, তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও আইনি চাপ সৃষ্টি করে পুরো পরিবারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকার ছেলে অংঅং জুয়েল অভিযোগ করেন,বিষয়টি এখানে থেমে থাকেনি। তার দাবি, মেথোইন রাখাইন নিজ মেয়েকে দিয়ে তাদের ঘর থেকে তার মায়ের ব্যাংকের চেকবই চুরি করিয়ে নেন। পরে সেই চেক ব্যবহার করে মেয়ের জামাই ক্যহিনের মাধ্যমে আরেকটি ভুয়া মামলা করার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট একজন আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘চেকবইটি চুরি হওয়ার বিষয়টি প্রথমে তার মা বুঝতে পারেননি। তবে নোটিশ পাওয়ার প্রায় চার মাস আগেই, ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট তিনি চেকবই হারানোর বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে ওই লিগ্যাল নোটিশেরও যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছে।’
অংঅং জুয়েলের অভিযোগ, মেথোইন রাখাইন ও তার ছেলে কলেজ শিক্ষক জমাংনাইং একের পর এক ষড়যন্ত্র করে তাদের পরিবারকে বিপদে ফেলছেন। তিনি বলেন, ‘মামলার চাপ আর দেনা শোধ করতে গিয়ে আমাদের বসতভিটাও অন্যের কাছে বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শুনছি, মায়ের স্বাক্ষর নকল করে আরও টাকা নেওয়ার ভুয়া স্ট্যাম্পও আদালতে দেওয়া হয়েছে।’
বর্তমানে পরিবারটির অবস্থা খুবই নাজুক। সংসারে নিয়মিত আয় নেই। মেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানান অংঅং জুয়েল। তিনি বলেন, ‘কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটছে। মায়ের চাকরি ফিরে না এলে কী হবে বুঝতে পারছিনা।’
৯৩ ব্যাচের ছৈয়দ করিম জানান, বান্ধবী চেনুইং রাখাইনের বিষয়টি আসলেই দুঃখজনক। শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে বিনীত অনুরোধ মিথ্যা মামলা থেকে অব্যহতি দিয়ে পুনরায় চাকরী ফিরিয়ে দেয়া হোক।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, ‘ঘটনাটি অমানবিক ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে ধারণা পাওয়া গেছে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হয়েছে।
তিনি জানান, মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
All rights reserved © 2020 paharechok.com||
এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি