ঋণের টাকা ফেরত নিয়ে বিরোধের জেরে ননথাবুরি প্রাদেশিক প্রশাসনিক সংগঠনের চেয়ারম্যানকে গুলি; হামলাকারী সাবেক আইনপ্রণেতা গ্রেপ্তার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
থাইল্যান্ডে স্কুলে বন্দুক হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠে একটি স্থানীয় সরকারি কার্যালয়ে ঢুকে এক কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার ননথাবুরি প্রদেশের সরকারি কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত কর্মকর্তা ননথাবুরি প্রাদেশিক প্রশাসনিক সংগঠনের চেয়ারম্যান। তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগে সাবেক আইনপ্রণেতা চালং রিউরাংকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধার দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে চালংয়ের বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরেই তিনি সরকারি কার্যালয়ে গিয়ে চেয়ারম্যানের ওপর হামলা চালান।
পুলিশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াত্তানা ইজিন সাংবাদিকদের বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা কাজ করেছে।”
হামলায় ওই কর্মকর্তার গাড়িচালকও গুলিবিদ্ধ হন। তবে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়। ফরা নাং ক্লাও হাসপাতালের পরিচালক ড. সাকল সুকপ্রোম জানান, গুলিবিদ্ধ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ হেফাজতে চালং দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধ মেটাতেই তিনি ওই কর্মকর্তার মুখোমুখি হতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
চালং বলেন, “তিনি (চেয়ারম্যান) যখন গাড়ি চালিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন একটি পিস্তল বের করেন। তাই আমি গুলি চালাই।” তবে নিহত কর্মকর্তা আদৌ সশস্ত্র ছিলেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য জানায়নি।
সরকারি কার্যালয়ে এ হামলার মাত্র কয়েক দিন আগে ননথাবুরি প্রদেশেই ঘটে ভয়াবহ স্কুল বন্দুক হামলা।
গত শুক্রবার ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর প্রথমে নিজের বাড়িতে এবং পরে দেবাসিরিন ননথাবুরি স্কুলে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় হামলাকারী কিশোরসহ ৯ জন নিহত এবং ২০ জনের বেশি আহত হন।
প্রায় চার বছরের মধ্যে এটি থাইল্যান্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বন্দুক হামলা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
উইকেন্ডের ছুটির পর সোমবার সকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ফিরলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ব্যাংককে দেবাসিরিন স্কুলের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মেটাল ডিটেক্টর বসিয়ে শিক্ষার্থীদের তল্লাশি করা হয়।
৫৪ বছর বয়সী অভিভাবক থিদারাথ সোংরাত বলেন, “শিক্ষার্থীরা বিপজ্জনক কিছু বহন করছে কি না তা নিশ্চিত হতে মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহারের বিকল্প নেই।”
স্কুল পরিচালক ভিথান প্রমসিন্তুসাক বলেন, “যে বিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা, সেখানে এমন কিছু ঘটতে পারে তা আমরা ভাবতেও পারিনি।”
তিন মাসের মধ্যে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা
স্কুলে বন্দুক হামলার পর থাইল্যান্ডের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশটির বিদ্যালয়গুলোতে নতুন নিরাপত্তা প্রোটোকল চালু করা হবে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহড়া, বুলিং বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং অস্ত্র ও নিষিদ্ধ সামগ্রী শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্কুলে হামলার পর দেশটিতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছেন থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল। প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন বন্ধে পুলিশকে তল্লাশি চৌকি বসানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আনুতিন সাংবাদিকদের বলেন, “প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরার অধিকার কারও নেই। আত্মরক্ষার অজুহাত দিয়েও অস্ত্র বহন সমর্থন করা যায় না।”
থাইল্যান্ডে নাগরিকদের হাতে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র
গবেষণা সংস্থা স্মল আর্মস সার্ভে-এর ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের সাধারণ নাগরিকদের হাতে আনুমানিক ১ কোটি ৩ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
দেশটিতে প্রতি ১০০ জন বাসিন্দার বিপরীতে প্রায় ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির বর্তমান অস্ত্র লাইসেন্স ব্যবস্থায় বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্রের আবেদনকারীর মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা না থাকা, ২০ বছর বয়সীদের অস্ত্র পাওয়ার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর লাইসেন্স পুনর্বিবেচনার বাধ্যবাধকতা না থাকা।
পরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে স্কুল ও সরকারি কার্যালয়ে বন্দুক হামলার ঘটনায় থাইল্যান্ডে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।