নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের চার সাবেক কর্মকর্তাকে পৃথক তিন ধারায় মোট ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাদের প্রত্যেককে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এর বিচারক মুহা. হাসানুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজীব দে।
দণ্ডপ্রাপ্তরা কারা
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—
কাজী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট (কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগ ও ইনভেস্টমেন্ট বিভাগ)
আবু মোহাম্মদ সাঈদ খান, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট
প্রবীর কুমার ভৌমিক, সাবেক সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার
শওকত আলী, সাবেক কর্মকর্তা
যে সাজা দিয়েছেন আদালত
আদালতের রায়ে—
বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধে প্রত্যেককে ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জালিয়াতির অপরাধে প্রত্যেককে ৫ বছরের কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের অপরাধে প্রত্যেককে ৫ বছরের কারাদণ্ড, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মীর আহম্মেদ আলী সালাম জানান, তিন ধারার সাজা একত্রে কার্যকর হবে। ফলে প্রত্যেক আসামিকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালতে যা ঘটেছে
রায় ঘোষণার সময় আসামি শওকত আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তার আইনজীবী কামরুল ইসলাম সময়ের আবেদন জানিয়ে বলেন, শওকত আলীর স্ত্রী অসুস্থ এবং তার ভাবী মারা গেছেন।
তবে আদালত আবেদন নামঞ্জুর করে তার জামিন বাতিল করেন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
অন্য তিন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালের ৪ নভেম্বর মোহাম্মদ ইউসুফ আলী নামে এক ব্যক্তি ঢাকা ব্যাংকে হিসাব খুলে ১৭ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। জামানত হিসেবে তিনি কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের এক হাজার এবং মেঘনা সিমেন্ট লিমিটেডের সাড়ে সাত হাজার শেয়ার জমা দেন।
পরবর্তীতে তার আবেদনের পর ঋণের পরিমাণ ১৭ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪ লাখ টাকা করা হয়।
পরে তদন্তে দেখা যায়, জামানত হিসেবে জমা দেওয়া শেয়ারগুলো ছিল ভুয়া। অভিযোগে বলা হয়, জাল শেয়ার ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া শওকত আলী হিসাব খোলার সময় ইউসুফ আলীকে শনাক্ত করে অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে সহযোগিতা করেন।
দীর্ঘ বিচার শেষে রায়
এ ঘটনায় ঢাকা ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সিরাজুল হক ২০০৮ সালের ৩১ মে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন।
প্রথম তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর শওকত আলীকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও বিচার চলাকালে মামলাটি অধিকতর তদন্তে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে দুদকের সহকারী পরিচালক কামিয়াব আফতাহি-উন-নবী ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট নতুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন, যেখানে চার কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়।
তবে ঋণগ্রহীতা মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর সঠিক নাম-ঠিকানা শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় অভিযোগপত্রে তাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
গত বছরের ১৬ জানুয়ারি আদালত চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। বিচার চলাকালে ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন।