নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে ‘আদিবাসী গোষ্ঠী নেই’ এবং দেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।
বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিচিত্রা তির্কি ও সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ উল্লেখ করে পরিষদ বলেছে, বাঙালি ও আদিবাসী—সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং বাংলাদেশি। তবে বাঙালি ও আদিবাসী পৃথক জাতিগত পরিচয় বহন করেন।
পরিষদের দাবি, দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, রংপুরসহ সিলেট ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও, বেদিয়া (মাহাতো), কুর্মি (মাহাতো), রাজোয়ার, তুরি, লোহার, মালো, পাহাড়িয়া/মালপাহাড়িয়া, গঞ্জু, ভূমিজ, বাগদি, মাহালী, মুসহর, কোল, ভুঁইমালি, বড়াইক, কোচ, তেলী, গড়াইত, নুনিয়া, ভুঁইয়া, রবিদাস, রাজভর, কাদর, হাড়ি ও পাটনিসহ ৩৮টির বেশি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রান্তিক জাতিসত্তার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ১৯৪৪ সালে নওগাঁর বদলগাছীতে পাহাড়পুর বা সোমপুর বৌদ্ধবিহারের কাছে প্রতিষ্ঠিত পাহাড়পুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেই ৬৫টির বেশি ‘আদিবাসী’ নামযুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে বলে দাবি করেছে পরিষদ।
খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রসঙ্গ
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ২০০৩ সালের একটি বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেওয়া ওই বাণীতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের জনগোষ্ঠীরই একটি অংশ আদিবাসী। আদিবাসীরাও আর সকলের মতই সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের নাগরিক।’
পরিষদ বলেছে, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি না থাকলেও দেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এ ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলতে তফসিলে উল্লিখিত বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেশের আদিবাসীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৭ ধারাতেও ‘আদিবাসী’ শব্দ উল্লেখ করে ভূমি সুরক্ষার বিধান রয়েছে বলে দাবি করেছে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ।
দুই মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে চিটাগাং হিলট্র্যাকস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের মূল পরিচয় বাংলাদেশি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী গোষ্ঠী’ নেই; সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী এবং সংবিধান অনুযায়ী সব নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।
একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্যের পর জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বৈষম্যহীন দেশ গঠনের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ‘আদিবাসী’ শব্দকে কেন্দ্র করে অপরাজনীতি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।