ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বক্তব্যে সংকট সমাধানের আশা আরও অনিশ্চিত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি পুনর্বহাল এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সরকারি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের ওই সূত্রের দাবি, পারস্য উপসাগরে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এখনো তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যেই ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক বক্তব্য সংকট নিরসনের সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সূত্রটি জানায়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা এবং চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের’ ঘোষণা দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেস্তে যায়। গত ৭ জুলাই ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করেন। এর এক সপ্তাহ পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও চুক্তিটি ‘স্থগিত’ করার কথা জানায়।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি ইরান। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনও তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এর মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
ইরানি সূত্রটি রয়টার্সকে বলেন, “মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হওয়া আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে আসা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।”
বুধবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। ইরানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, দেশটি শুধু কথায় বড় বড় দাবি করে, বাস্তবে কিছু করতে পারে না এবং পশ্চিম এশিয়ায় তাদের আর আগের মতো প্রভাব নেই।
তবে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানের গঠিত ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ জানিয়েছে, জলপথটি এখনো বন্ধ রয়েছে। ইরানের দেওয়া শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এটি খোলা হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
৬০ দিনের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি নাকচ
জুনের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে দুই পক্ষের সম্মতিতে মেয়াদ বাড়িয়ে ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু পাকিস্তানি সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ওই ৬০ দিনের মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তবে রয়টার্সের কাছে ইরানি সূত্রটি এ দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, “মেয়াদ বাড়ানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ইরানের দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদকাল আদৌ শুরুই হয়নি, তাই তা বাড়ানোর কিছু নেই। চুক্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে এবং তার কয়েক দিন পর বের হয়ে যায়।”
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, অস্থির জ্বালানি বাজার
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ এবং পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ হতো।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে রেখেছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে এখনো চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার লোহিত সাগরে সন্দেহভাজন হুতি হামলা এবং ওমান সাগরে মার্কিন হামলার পৃথক দুটি ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ওমান সাগরে মার্কিন নৌ-অবরোধ অমান্য করায় পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজের স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অকার্যকর করতে মার্কিন এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৮ ডলার এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম প্রায় ৮৩ ডলারে ওঠানামা করছে।
ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।