নিজস্ব প্রতিনিধি :
বাসস্ট্যান্ডের একটি পরিত্যক্ত ভবন ধুয়েমুছে ও রঙ করে হিমাগার হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিমাগার বলে চিহ্নিত করার আগে এই পরিত্যক্ত ভবনটিতে বাসস্ট্যান্ডের লোকজন মলমূত্র ত্যাগ করতেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবান শাখা সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমাগারের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার টন পচনশীল ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই বান্দরবানে উৎপাদিত আম, জাম্বুরা, পেঁপে, আদা, হলুদ, মিষ্টি কুমড়া, আনারস, কমলা, কফি ও কাজুবাদামের মতো অর্থকরী ফসল সংরক্ষণের জন্য একটি আধুনিক হিমাগার নির্মাণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় বান্দরবানের জন্য ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রধান শর্তই ছিল বান্দরবান শহরে সুবিধাজনক এলাকায় ৪০-৫০ টনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি নান্দনিক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত হিমাগার ভবন নির্মাণ করা। বাস্তবে এ জন্য নতুন কোনো ভবন তৈরি না করে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বহু বছর ধরে পড়ে থাকা একটি পরিত্যক্ত ভবনকে সংস্কার করে এই হিমাগার বানানো হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরনো পরিত্যক্ত ভবনটির দেয়ালে নতুন রঙ করা হয়েছে। ভবনটির দুপাশে বৃষ্টির পানি ঝিরঝির করে পড়ছে। প্রকল্পের অর্থবরাদ্দ ছাড় দেওয়া হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবান শাখার প্রকৌশলীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ঠিকাদার এখন পর্যন্ত হিমাগারে কোনো সরঞ্জাম এই ভবনটিতে আনেননি। ফলে হিমাগার নাম দিয়ে ভবনটি কেবল ধোয়ামোছাতেই কাজ শেষ। মিজানুর রহমান নামের স্থানীয় বাসিন্দা আমাদের সময়কে বলেন, ২০১২ নির্মিত ভবনটি রাতারাতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা দেখে আমরা তাজ্জব বনে গেছি। স্থানীয় আম ব্যবসায়ী বাসিংউ মারমা বলেন, আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম যে, এবার পাহাড়ে একটা আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ হবে, কৃষকরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আমাদের চোখ বেঁধে ধোঁকা দিল। এটা অর্থের হরিলুট ছাড়া আর কিছু নয়।
পরিত্যক্ত ভবনকে ৪০-৫০ টনের কাঁচামাল ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হিমাগার বানানো হলে তা কতটা নিরাপদ হবে জানতে চাইলে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জামাল বলেন, ভবনটির পাইলিং লোড টেস্ট, সয়েল টেস্ট করা জরুরি ছিল। প্রকৌশলীদের কাছে আদৌ এসবের টেস্ট রিপোর্ট আছে কিনা জানা দরকার। কারণ ৪০-৫০ টন ওজনকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে নতুন করে হিমাগার নির্মাণ করা উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্পটির শুরু থেকেই ব্যাপক গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি), দরপত্র প্রক্রিয়া, কার্যাদেশ কিংবা ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট খাতসংক্রান্ত কোনো তথ্যই দপ্তরের সাধারণ লোকজনের জন্যও উন্মুক্ত করা হয়নি।
জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াসির আরাফাত বলেন, বান্দরবান শহরে খাসজমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে বাস স্টেশনে পুরনো ভবনকে সংস্কার করে হিমাগারটি করা হয়েছে। চলতি জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। হিমাগার ভবনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো সরঞ্জাম না আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঠিকাদার মালামাল বিদেশ থেকে আনছেন, শিগগির এখানে আনবেন। তবে তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম বলতে সম্মত হননি। এ কারণে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।
পরিত্যক্ত ভবনকে হিমাগার বানানোর ঘটনায় বান্দরবানের সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি অংচ মং বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে অতীতেও দুর্নীতির অনেক অভিযোগ উঠেছে। তবে একটি পরিত্যক্ত ভবনকে হিমাগার দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ অতীতের সব অভিযোগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, বোর্ডের অধীনে পাহাড়ে যত উন্নয়ন কাজ হচ্ছে, তার সবটির ওপর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া সময়ের দাবি।